এক যুগ পর চিনিকল চললো তিন মাস, তবুও উৎপাদন তলানীতে !

0

আব্দুল্লাহ আল সুমন বিশেষ প্রতিনিধি (ঠাকুরগাঁও): – দেশের উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁও চিনিকল জেলার একমাত্র প্রাচীন শিল্পকারখানা। এ শিল্পের সঙ্গে শুধু শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে আছে, এমনটি নয়, কৃষকসহ জেলার বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবন ও জিবীকা এর সঙ্গে জড়িত। আধুনিকায়নের মাধ্যমে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের উপযোগী করে চিনিকলগুলোকে লাভজনক হিসেবে গড়ে তুলতে দ্রæত বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন না করা গেলে মুখ থুবরে পড়বে এ শিল্পকারখানাটি।

২০২০-২১ মাড়াই মৌসুমের গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর আখ মাড়াই উদ্বোধন হয় ঠাকুরগাঁও চিনিকলের। দীর্ঘ এক যুগ পরে ঠাকুরগাঁও চিনিকল সক্রিয় ছিলো ৯১ দিন। এবারে ঠাকুরগাঁও চিনিকলে পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁও অঞ্চল সমূহের প্রায় দেড় লক্ষ মে:টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ১ লক্ষ ১৩ হাজার ৬ শ ১৫ মে:টিন আখ মাড়াই করা হয়েছে। যা থেকে চিনি উৎপাদন হয়েছে ৬ হাজার ৫২ দশমিক ৫ মে:টন। চিনিকল কর্তৃপক্ষ বলছে ঠাকুরগাঁও সহ তিনটি মিলের আখ এখানে মাড়াই করা হয়েছে। যে পরিমাণ চিনি উৎপাদন হয়েছে তা লক্ষ্য মাত্রা থেকে অনেক দূরে। চিনি উৎপাদনের প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৯ হাজার মে:টন।

বুধবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াৎ হোসেন এই প্রতিবেদককে এক কথায় বলেন, আখ চাষ হলে এ শিল্প টিকবে নয়তো এ শিল্প টিকবেনা।

ঠাকুরগাঁও আখচাষী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো: আনোয়ার হোসেন বলেন, যে আখচাষী ১৭ মাস মেয়াদে আখ চাষ করবে সে যদি সময় মতো আখের দাম না পায় তাহলে সে কেনো আখ চাষ করবে? আমরা এখনো চিনিকলের কাছ থেকে প্রায় ৫ হাজার কৃষক ৪ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা পাবো। এছাড়াও সার ও কীটনাশক সময়মতো পাচ্ছিনা কৃষকরা। যার ফলে আখ চাষ করতে আমরা কৃষকরা নিরুৎসাহিত হচ্ছি।

কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ১৯৫৮-৫৯ মাড়াই মৌসুমে ঠাকুরগাঁও চিনিকলের প্রথম আখ মাড়াই শুরু । শুরু থেকে এ চিনি কলের আখ মাড়াইয়ের ধারণ ক্ষমতা ছিলো দেড় লক্ষ মে:টন আখ। সেখানে জেলায় আখ উৎপাদন হতো প্রায় আড়াই লক্ষ মে:টন। ধারণ ক্ষমতার বেশি আখ মাড়াই হতো ঠাকুরগাঁও চিনিকলে।

কিন্তু পরবর্তীতে ধীরে ধীরে কেন আখ উৎপাদন কমে গেলো এ প্রশ্নের জবাবে জেলার বিভিন্ন বিশ্লেষকগণ বলছেন, আখের ন্যয্য মূল্য কৃষকরা না পাওয়ার কারনে চাষীরা বিভিন্ন মৌসুমী ফসল আবাদ করছেন। তাছাড়া সহজভাবে আখ উৎপাদনের যে সুবিধা তা থেকে কৃষকদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। যেমন: কৃষককে সার কিটনাশকের সহজ সরবরাহ না করতে পারা, কৃষকদের সাথে সমন্বয় করে আখ চাষে উদ্বুদ্ধ করতে না পারা এবং নতুন কৃষকদের প্রশিক্ষণ সহ আখের লাভজনক অবস্থাকে পরিস্কার করতে না পারা। সেই সাথে ঠাকুরগাঁও চিনিকলটি পুরাতন হয়ে যাওয়ায় এখানে আখ মাড়াইয়ের ধারণ ক্ষমতাকে ব্যহত হয়েছে। চিনিকলটি আধুনিকায়ন না করার কারনে কৃষক আখ চাষে বিমুখ হয়ে পড়ছে।

ঠাকুরগাঁও রাষ্ট্রয়াত্ব চিনি শিল্প রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মাহাবুব আলম রুবেল বলেন, যে কারনে চিনিকল কর্পোরেশন লোকসানের অযুহাত দেখিয়ে সেতাবগঞ্জ ও পঞ্চগড় চিনিকল বন্ধ করে ঠাকুরগাঁও চিনিকলে আখ মাড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো বাস্তবে তা ভুল বলে প্রমাণিত হলো। চিনিকল কর্পোরেশন ভেবেছিলো দুই জায়গার আখ একখানে মাড়াই করা গেলে অধিক উৎপাদন হবে এবং লোকসানের হাত থেকে বাঁচা যাবে। কিন্তু আমরা দেখলাম দূর থেকে আখ পরিবহন করায় আখ শুকিয়ে যাওয়ায় চিনি আহরণ অনেক কমেছে। যার ফলে কর্পোরেশন যে লক্ষ্য মাত্রা তৈরি করেছিলো সে লক্ষ্যমাত্রার থেকেও চিনি কম উৎপাদন হয়েছে। তাহলে বাস্তবতা দাড়ালো, সেতাবগঞ্জ ও পঞ্চগড়ের আখ চাষীরা আর কখনো আখ চাষ করবেনা। আর এর প্রভাব ঠাকুরগাঁও চিনিকলে পড়বে। চিনিকলটি ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে পতিত হবে। তাই আমরা বলছি ঠাকুরগাঁও চিনি কলটি আধুনিকায়ন করে বহুমূখি পণ্য উৎপাদন না করা গেলে চিনিশিল্পটাকে বাঁচোনো সম্ভব হবেনা।

অন্যদিকে চার মাস যাবৎ ঠাকুরগাঁও চিনিকলের শ্রমিকরা বেতন পাচ্ছেনা। সেই সাথে চাকরি শেষে গ্র্যাচুয়িটর টাকাও পাচ্ছেনা শ্রমিকরা এমন অভিযোগও রয়েছে অবসরপ্রাপ্ত চিনিকল শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের।

ঠাকুরগাঁও চিনি কলের শ্রমিক ইউনিয়ন কর্মচারীর সভাপতি মো: উজ্জল হোসেন বলেন, আমরা ৫৯৮ জন শ্রমিক ও দৈনিক হাজিরা ও কানামুনা শ্রমিক প্রায় সাড়ে ৩ শ জন। আমরা শ্রমিকরা প্রায় ৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছি। চার মাস ধরে বেতন পাচ্ছিনা। এদিকে আখচাষীরাও আখের টাকা পাচ্ছেনা। তার মানে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ঠাকুরগাঁও চিনিকলটি বন্ধ করার পায়তারা চলছে।

বেতন বকেয়ার বিষয়ে ঠাকুরগাঁও চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, শ্রমিক ও আখচাষীদের শিঘ্রই বকেয়া টাকা প্রদান করা হবে। সেই চেষ্টায় করছি।

এদিকে গত বছর পহেলা অক্টোবর ঠাকুরগাঁও সুগারমিল পরিদর্শনে এসে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল বন্ধ হবে না। তিনি বলেছেন, সরকারি এসব চিনিকলের কোনও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনাও সরকারের নেই। বরং চিনিকলগুলোর আধুনিকায়ন ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করে এগুলোকে লাভজনক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এখন ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ ভাবছে কখন বাস্তবিক রুপ নেবে মন্ত্রীর এই বাণী? কবে ঠাকুরগাঁও চিনিকল আধুনিকায়ন করার প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সরকার?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে