বসন্তের হাওয়ায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে যেন তাহিরপুরের শিমুল বাগান।

0

আমির হেসেন, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃঃ

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার

মহামারি করোনার ভাইরাসের কারণে থমকে যাওয়া প্রাণ এবং প্রকৃতি ফের পুরনো রূপে ফিরতে শুরু করেছে। দীর্ঘ এক বছরের ভয়-ভীতি, উৎকণ্ঠা কাটিয়ে উঠছে মানুষ। এসেছে করোনা ভাইরাসের টিকা, চলছে প্রয়োগ। এতে দমবন্ধ পরিবেশের সমাপ্তি ঘটতে শুরু করেছে। প্রকৃতিতেও এসেছে পরিবর্তন।

এই পরিবর্তনের মধ্যেই রোববার ১৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হচ্ছে ঋতুরাজ বসন্ত মাস। এদিন আবার বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এ দুইয়ে মিলে এবার উৎসব হবে, প্রাণে প্রাণে মিলবে প্রাণ। ফুলের সৌরভে মেতে উঠবে চারপাশ। গাঁদা ফুলের রঙেই সাজবে তরুণীরা। পরবে বাসন্তী রঙের শাড়ি। খোঁপায় গুঁজবে ফুল, মাথায় টায়রা আর হাতে পরবে কাচের চুড়ি। তরুণরাও বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি বা ফতুয়া পরে নামবে বাংলার পথে-ঘাটে। আর পথে-ঘাটে নামা তরুণ-তরুণীদের ডাকছে তাহিরপুরের শিমুল বাগান। বাগানের প্রতিটি গাছে এসেছে ফুল। বেড়েছে সৌন্দর্য। সব মিলিয়ে শীতের আড়ষ্ঠতা ভেঙে বসন্ত আর ভালোবাসায় ডাকছে শিমুল বাগান। এমনিতেই বসন্ত এলেই প্রকৃতি নিজ রূপে সেজে উঠে। হয়ে উঠে প্রাণচাঞ্চল্য। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। এবার যেন প্রকৃতি একটু বেশিই সেজেছে। ভেঙেছে শীতের আড়ষ্টতা। গাছে গাছে এসেছে নতুন পাতা, স্নিগ্ধ সবুজ কচি পাতার ধীর গতিময় বাতাস জানান দেয় নতুন লগ্নের।ফাল্গুনের আগমনে পলাশ, শিমুল গাছে লেগেছে আগুনে খেলা।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার মানিগাঁও গ্রামে ২ হাজার ৪ শতক জমিতে গড়ে উঠা শিমুল বাগানের প্রতিটি গাছে এসেছে ফুল। রূপ আর সম্পদের নদী যাদুকাটার তীরে ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই শিমুল বাগানই দেশের সবচেয়ে বড় শিমুল বাগান।দেশের অন্যতম সৌন্দর্যমণ্ডিত নদী যাদুকাটার তীরে ঘেঁষে উঠা শিমুল বাগানে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ফুল ফুটতে শুরু করে। লাল ফুলের কারণে পুরো এলাকায় হয়ে উঠেছে রক্তিম আভা।ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে, মাঝে সৌন্দর্যে ষোলো কলায় পরিপূর্ণ যাদুকাটা নদী, এপারে শিমুল বাগান। সব মিলেমিশে গড়ে তুলেছে প্রকৃতির এক অনবদ্য কাব্য। লাল পাপড়ি মেলে থাকা রক্তিম আভায় যেন পর্যটকদের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। এদিকে ফাগুন আসার আগে আগেই স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তাহিরপুরে পর্যটকরা আসতে শুরু করেছেন। আসছেন পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এতে বেড়েছে পেশাদার ফটোগ্রাফারদের ব্যস্ততা। পাশাপাশি ব্যস্ততা বেড়েছে শিমুল ফুল দিয়ে মালা, ভালোবাসার প্রতীক তৈরি করার কারিগরদের মধ্যেও।শুক্রবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়- বসন্তের আগমনী বার্তা জানিয়ে সারি সারি শিমুল গাছে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। বাগানের সবকটি গাছে পরিপূর্ণ ভাবে ফুল ফুটতে আরও ৩-৪ দিন সময় লাগবে হয়তো। তখন বাগানে যতদূর চোখ যায় কেবল দেখা মিলবে শিমুলের রক্তিম আভা। আর এ দৃশ্যের অবলোকন করতে ২-৪ দিন অপেক্ষা করতেই হচ্ছে প্রকৃতিপ্রেমীদের।

একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত সিলেট থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা ইমরান আহসান জানান, শিমুল বাগানে অনেক দিন ধরে আসার পরিকল্পনা ছিল। আজ (গতকাল শুক্রবার) পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছি। দীর্ঘপথ জার্নি করে এখানে পৌঁছে সব ক্লান্তি ভুলে গেছি। আর শিমুল বাগানের সৌন্দর্য সত্যিই মুগ্ধ করবে যে কাউকে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় অনেকটাই ভুগিয়েছে এটুকু পথ আসতে গিয়ে।

শিমুল বাগানে ঘুরতে আসা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বিবদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী এ প্রতিবেদককে বলেন, সারি সারি রক্তা রাঙা শিমুল ফুল দেখে সত্যিই অভিভূত। তবে বাগানের সব ফুল হয়তো পুরোপুরি এখনও ফুটেনি। আর ৩-৪ দিন পরে আসলে আরও অনেক সৌন্দর্যের দেখা মিলতো। বাগানের পরিধি কিন্তু অনেক বিশাল। তবে ঘুরতে আসা ভ্রমণপিয়াসীরা কেন জানি বাগানের শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থানেই জটলা বেধে ঘুরাফেরা করে তা বুঝলাম না। পুরো বাগান ঘুরে না দেখলে বাগানের বিস্তৃত সৌন্দর্য দেখা থেকে মিস করবেন আগতরা। কিশোরগঞ্জ থেকে ঘুরতে আসা রিয়া মনি জান্নাতুল বলেন, আমরা ৭ জন বন্ধুবান্ধব শিমুল বাগানের সৌন্দর্য দেখতে গত বছর পরিকল্পনা করেছিলাম। আজ (গতকাল শুক্রবার) বাগানে আসতে পেরে এবং এর সৌন্দর্য দেখে সত্যিই মুগ্ধ। তবে যাত্রাপথে নাজেহাল যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে আমাদের। যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যতীত এ এলাকার সব কিছুই ভালো লেগেছে। আবারও আসার ইচ্ছে আছে। চিকিৎসক হাসান জামিন বলেন, আজ (গতকাল শুক্রবার) শিমুল বাগানে একাই এসেছি। পহেলা ফাল্গুন পরিবার নিয়ে আবার আসবো। এসে যা দেখলাম তাতে মনে হল, পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে তাহিরপুরে। তবে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও এর প্রসার ও বিস্তৃতি ঘটছে আর এ পর্যটন সম্ভাবনা সমুজ্জ্বল করে রাখতে হলে প্রথমেই পর্যটকদের মানসম্মত থাকা-খাওয়া ও নাজেহাল যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে