বাঁশ : হাহাকারের প্রতিধ্বনি

0

ডেস্ক দীপংকর দীপক

বাঁশ। সহজ-সরল ভাষার চমৎকার একটি উপন্যাস। নিয়তির জালে আটকে পড়া মফস্বলের কিছু অসহায় মানুষের যাপিত-জীবনের দুঃখ-কষ্ট, আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, স্বপ্ন-কল্পনা ও জীবন সংগ্রাম নিয়ে উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে।

কথায় আছে, বিয়ে হচ্ছে ‘দিল্লি কা লাড্ডু’। খেলেও পস্তাতে হয়, না খেলেও পস্তাতে হয়। বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন উপন্যাসের নায়ক আনসারি। বিয়ের কী যন্ত্রণা আর বউয়ের কী জ্বালা—তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন তিনি। সংসার চালাতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেতে হয়েছে তাকে। চড়া সুদে ঋণ এনে বাঁশের ব্যবসা করে খেয়েছেন ধরা। এর ওপর বউয়ের নিত্যদিনের অত্যাচার। সব মিলিয়ে তার জীবনে চরম হতাশা নেমে আসে। এ হতাশা, ব্যর্থতা ও যন্ত্রণাকে সঙ্গী করেই পথ চলতে হয় তাকে।

উপন্যাসের আরেকটি ব্যতিক্রম দিক হচ্ছে—এটি পুরোপুরি নায়িকাশূন্য। আর নায়ক আনসারির স্ত্রী মরিয়ম এখানে খলনায়িকার ভূমিকায় অবতীর্ণ। উপন্যাসে একটি সাহসী নারী চরিত্র রয়েছে। নাম মনোয়ারা। মেয়েটি প্রায় অন্ধ। তবে জীবনীশক্তি প্রচুর। তার বাবা হাতেম বেপারী ভয়ঙ্কর একজন খুনি। অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছেন। তাই এলাকাবাসীকে বাঁচাতে নিজের বাবাকেই লোক লাগিয়ে খুন করান প্রায় অন্ধ মেয়েটি। হাতেম বেপারী মারা যাওয়ায় আনসারি ঋণমুক্ত হন। একইসঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে তিনি হাতেম বেপারীর সব সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্ব পান। এভাবেই উপন্যাসের শেষপ্রান্তে এসে ঘুরে দাঁড়ায় অসহায় আনসারির জীবন।

‘বাঁশ’ উপন্যাসে বেশ কিছু শিক্ষামূলক বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। বাক্যগুলো ব্যক্তি জীবনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। নিম্নে কয়েকটি লাইনের উদাহরণ দেওয়া হলো-
১. পুরুষ মানুষের কাছে টাকা হচ্ছে রক্তের মতো।
২. বিপদে মানুষকে অনেক কিছুর সঙ্গে আপোস করতে হয়।
৩. বড়ই আজব এ রাজনীতি।
৪. প্রকৃতির কাছে যৌবনশক্তি জমা দেওয়ার সময়।
৫. গ্রামের মানুষ যেমন সোজা, তেমন ত্যাড়া।

উপন্যাসে চমৎকার কিছু আধুনিক শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো কাহিনিপ্রবাহকে আরও গতিশীল করে তুলেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে- লু হাওয়া, মাথা ভো ভো করা, ক্যাটক্যাট করা, খিঁচুনি মার্কা ঝাড়ি, কটকটা গলা, গলগল করে বমি, কুণ্ডলি পাকিয়ে ঘুমানো, চটচট দাগ, ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া, কষ্ট কষ্ট লাগা ইত্যাদি।

রক্ত দিয়ে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করেছি। শ্লীল-অশ্লীল দুই ধরনের শব্দই ভাষার ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজন। সুতরাং রচনাশৈলীকে গতিশীল করতে দুই ধরনের শব্দ ব্যবহারই যুক্তিসঙ্গত। এ উপন্যাসেও লেখক প্রয়োজনের তাগিদে কিছু অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছেন। এতে লেখার বিষয়বস্তু আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কয়েকটি শব্দ— হারামজাদা, হারামজাদি, শালা, কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা, মাগি, ছাগলের গু ইত্যাদি।

উপন্যাসের কাহিনিতে গতিময়তা আছে। এ কারণে একবারে বসে ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই পড়ে শেষ করা যায়। তা ছাড়া পড়াকালে পাঠকদের মনে হবে, চরিত্রগুলো তার খুব চেনা। তার আশপাশেই চরিত্রগুলো যেন ঘোরাফেরা করছে। বিশেষ করে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে। তারা এখান থেকে জীবন-জীবিকার নানা দিক ও দর্শনরসের শিক্ষামূলক স্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন।

উপন্যাসের লেখক কেএনএন লিংকু। ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালে সুদূর পাপুয়ানিউগিনির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। কঠিন কর্মজীবনের মধ্যে থেকেও লেখালেখি ও ক্যানভাসে রংতুলির চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি অত্যন্ত পরিশীলিত, আধুনিকমনা, সংস্কারবিরোধী, বন্ধুসুলভ, পরোপকারী, স্বল্পভাষী, ধৈর্যশীল ও স্বাধীনচেতা।

উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে মুক্তভাষ ফাউন্ডেশন। প্রচ্ছদ এঁকেছেন লেখক নিজেই। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে কাজী তানভীর আহম্মেদকে। বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা ১২৮ ও মূল্য ২৫০ টাকা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে